শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:৩৪ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার...

সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলাতেই জীবন পার সু চির

এম জেড মাহমুদ / ২২৭ পড়া হয়েছে:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলাতেই জীবন পার সু চির

রোহিঙ্গা গণহত্যার মতো ভয়ংকর একটা ঘটনায় তার প্রচ্ছন্ন ইন্ধন ছিল। কিন্তু তারপরও মিয়ানমারের জনগণের কাছে এখনো অতিপ্রিয় তিনি। দেশটির বহু মানুষের কাছেই তার পরিচিতি ‘মাদার সু চি’ (মা সু চি) বলে। আরও একধাপ এগিয়ে পশ্চিমা ধাঁচে ‘দ্য লেডি’ও বলে থাকে কেউ কেউ। আর এ কারণেই গত সোমবার ভোরে সেনাবাহিনীর হাতে তার গ্রেফতারের খবর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে স্বভাবতই এক ধরনের চাপা ক্ষোভ, বিস্ময় ও কষ্ট দেখা যায় দেশজুড়ে। মিয়ানমারের ‘গণমাতা’ বিপদে পড়েছেন কিন্তু তার সমর্থক ‘সন্তানরা’ কিছুই করতে পারছে না। একটা ভয় ও অসহায় বোধ গ্রাস করেছে তাদের।

মিয়ানমারের ‘গণতন্ত্রের পাখি’ অং সান সু চি এখন সেনার খাঁচায় বন্দি। তবে এবারই প্রথম নয়, প্রায় জীবনভরই সেনাবাহিনীর জেনারেলদের সঙ্গে ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলছেন তিনি। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করে বারবার বিজয়ীর বেশে সামনে এসেছেন। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে সম্ভবত হেরে গেলেন তিনি।

গত সোমবার রোহিঙ্গা গণহত্যায় অভিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অংম হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটে। এ বছরই তার অবসর নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবসরের বদলে আটঘাট বেঁধে ক্ষমতায় বসলেন তিনি। আগামী এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ সু চিকে এই এক বছর সেনা হেফাজতেই থাকতে হতে পারে। তার বিরুদ্ধে ‘অবৈধভাবে’ ওয়াকিটকির মতো যোগাযোগের যন্ত্রপাতি আমদানির অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রমাণিত হলে অন্তত তিন বছর জেল হতে পারে তার। সামনে আরও অভিযোগ আনা হতে পারে। এমনও হতে ‘জেল থেকে’ পারে আগামী নির্বাচনে অংশ অংশ নিতে পারবেন না তিনি।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সু চি : মিয়ানমারের স্বাধীনতার পিতা জেনারেল অং সানের কন্যা সু চি। ১৯৪৭ সালে তার বাবা যখন গুপ্তহত্যার শিকার হন তখন তার বয়স সবেমাত্র দুই বছর। অং সানকে মিয়ানমারে জাতির পিতা বলা হয় এবং তিনি সামরিক বাহিনী তাতমাডোরও প্রতিষ্ঠাতা। তার হত্যার পরের বছর ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হয়। প্রথম জীবনের বেশিরভাগই বিদেশে কাটিয়েছেন সু চি। পড়াশোনা অক্সেফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিয়ে করেন এক ব্রিটিশকে। ব্রিটেনের আর দশটা নারীর মতোই ছিল তার সংসার জীবন। সেখানেই জন্ম হয় তার দুই ছেলের। কিন্তু ১৯৮৮ সালে মৃত্যুশয্যাশায়ী মায়ের সেবার জন্য দেশে ফেরার পরই তার জীবন আমূল বদলে যায়। এ সময় ছাত্র আন্দোলন চলছিল দেশের সমাজবাদী একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে এমন কেউ ছিলেন না, যিনি সব বিরোধীকে একজোট করে শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবেন। ছাত্ররা তখন নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সু চিকে অনুরোধ করে এবং তিনি বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে যান। ৪৩ বছর বয়সে সামরিক জান্তা শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিলেন তিনি। ইয়াঙ্গুনের বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির শ্বেডগন প্যাগোডার সামনে পাঁচ লাখ মানুষের সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে শুরু হয় সু চির রাজনৈতিক জীবন। তিনি মৃদুভাষী ছিলেন কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার একাগ্রতা। ফলে দ্রুতই সেই আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৮৮ সালজুড়ে মিয়ানমারের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে সামরিক ও সমাজতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়। আর এসব বিক্ষোভে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকের ভূমিকায় দেখা যায় সু চিকে। সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে মিয়ানমার রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ডেভিড ম্যাথুওসন বলেছেন, ‘সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমারজুড়ে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। এর সময়টা ছিল চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ার আন্দোলন, বার্লিন দেওয়াল পতনের মাত্র এক বছর ও ভারত গোল্ডেন রেভ্যুলোশনের তিন বছর আগের। এ সময় দেশে একটা মুক্ত ও অবাধ্য নির্বাচন ও মানবাধিকার সুরক্ষার কথা বলছিলেন সু চি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা ছিল আধুনিক মিয়ানমারের একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আর সু চি ছিলেন তার মূর্ত প্রতীক।’


এই বিভাগের আরো খবর