শিরোনাম:
রোহিঙ্গা নিপীড়নকারীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর রায়পুরের ৬নং কেরোয়া ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহাদাত হোসেন লিটন কলাপাড়ায় ১ জেলেকে পিটিয়ে মারার অভিযোগ নৌ- পুলিশের বিরুদ্ধে” প্রাথমিকে নিয়োগ ও বেতন নিয়ে সুখবর দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব কুয়েতের লক্ষ্মীপুর যুবলীগের দু-গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত-১২ লক্ষ্মীপুর দলিল জালিয়াতির মামলায় ৩ আসামী কারাগারে লক্ষ্মীপুরে চার সন্তানকে ঘরে রেখে আগুন : মায়ের বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা নতুন ফ্ল্যাটে জীবনকে ভালোবাসছেন পরীমনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতি: গণিত মডেল টেস্ট ১
শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:২০ অপরাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার...

বড়শিতেই বাঁধা পটুয়াখালী বাউফলের অর্ধশত পরিবারের জীবন

পটুয়াখালী ( বাউফল) প্রতিনিধি / ৩৭৬ পড়া হয়েছে:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

 

বড়শির টোপে জড়িয়ে আছে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া। বড়শিতে চলে ওদের সংসার। বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় নদী-খাল ভরাট হয়ে মিঠা পানির মাছ কমে যাওয়া আর গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীতে কেবল কাজের ধরন পাল্টে গেলেও বড়শিতেই বাঁধা পটুয়াখালীর বাউফলের অর্ধশতাধিক পরিবারের  জীবন- জীবিকা।

ডিঙি নৌকায় ভেসে তেঁতুলিয়া নদীতে বড়শিতে মাছ শিকার করেন বাউফলের কালাইয়া গ্রামের শাহজাহান হাওলাদার।

জলবায়ুর পরিবর্তনে মিঠা পানির তেঁতুলিয়া নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও পোয়া, আইড়, ফা, শিলল, গাঁগড়া, রিটা, কাউন, ভোল, পাবদা, সরপুটি, কোরালের মতো বিভিন্ন মাছ পাইতাম।

এ্যাহন আর ওই সব মাছের দ্যাহা মেলে না।’ ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনাসহ বড়শিতে মাছ শিকারে সংসার চলে তার। বড়শিতে জড়িয়ে আছে চার ছেলেমেয়েসহ শাহজাহানের পরিবারের ছয় সদস্যের জীবন।

শাহজাহান হাওলাদার আরো বলেন, ‘আগে ইশা (ইলিশ) মাছ ধরতাম। অবরোধ ছাড়াও অনেক সময় নদীতে ইশা মাছ ধরোন যায় না। নদীতে গোনেও অনেক রোহমের মাছ বিদায় নিছে। প্যাডেতো ভাত দেওন লাগে? ঘর-সোংসার চালাইয়া রাহনের লইগ্যা বাধ্য অইয়া বড়শি বাই। প্যাড চলে বড়শি বাইয়া।’

শাহজাহান হাওলাদারের মতো কালাইয়া লঞ্চঘাট এলাকার শাহজাহান ফরাজি, রহিম খলিফা, লোকমান, কোডন রাঢ়ি, চরকালাইয়া গ্রামের লক্ষ্মণ সাধু, রিপন, জামাল আকন, আলতাফ হোসেন, সলেমন, চরওয়াডেলের হাবিব, ধুলিয়ার আ. খালেক, আদু ফরাজি, মমিনপুরের বাদামতলী এলাকার চান্দু মিয়া, চর মিয়াজানের রফিক, শাহআলমসহ উপজেলার মদনপুরা, নূরাইনপুর, বগীর খাল, শৌলা, বাদামতলী, মঠবাড়িয়া, ধুলিয়া, তালতলী মমিনপুর এলাকার প্রায় শ’খানেক ব্যক্তি সংসার চালাতে এ সময় তেঁতুলিয়া নদীতে বড়শিতে মাছ শিকার করছেন। এ ছাড়া কালাইয়া, বগী, তালতলি, চন্দ্রদ্বীপের বাতিরখাল, ধূলিয়াসহ নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বড়শিতে মাছ শিকারে সংসার চলে কয়েক শ ভাসমান পরিবারের।

তিথির পরিবর্তনে নদীর জোয়ার-ভাটার ধরনে বড়শিতে মাছ শিকারের কৌশলেরও পরিবর্তন করেন এরা। বর্ষায় বোয়াল, আইড়, কোরাল মাছ ধরা পড়ে। বড়শির আকার ও সুতার ধরনও থাকে ভিন্ন। আবার কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত পোয়া, রিটা, গাঁগড়া, গলদা চিংড়ি ধরা পড়ায় এ সময় অনেকেই ডিঙি নৌকায় ভেসে ছিপ বড়শি ফেলেন নদীতে। লালশো বা গেছে লাল পিপড়ের ডিম, অ্যাকাঙ্গি, মহুয়া ফুল, পুরনো মধু, মিষ্টির বাসি রস, আটাসহ বিভিন্ন ধরণের মসলা ব্যবহার করেন বড়শির টোপে। গলদা চিংড়ি ধরতে কেঁচোই ব্যাবহার করেন অনেকে। তবে সময়ের পবিবর্তনে কাজের ধরন কিংবা মাছ ধরার কৌশল পরিবর্তন হলেও যেন পরিবর্তন নেই এদের জীবন-মানের। বড়শিতে বাঁধাই এদের জীবন-সংসার।

এ সময়ে নদীতে আইড়, পোয়া, বোয়াল, পাঙাস, কোরালসহ মিঠা পানির বিভিন্ন মাছের পাশাপাশি নদীতে ধরা পড়ছে গলদা চিংড়ি। স্থানীদের সঙ্গে তেঁতুলিয়ার নিমদী, নারাখালী, তালতলী, চর রায়সাহেব, বড়ডালিমা, চরওয়াডেল, কালাইয়া বাদামতলী, ধুলিয়া পয়েন্টে বড়শিতে মাছ শিকারে ছুটে এসেছেন পাশের ভোলা, বাকেরগঞ্জ, পিরোজপুর, ঝালকাঠির অনেক মাছ শিকারি।

বাকেরগঞ্জ জেলার গোপালপুরের জলিল মৃধা (৫৫) জানান, ১৫-২০ বছর ধরে বড়শিতে মাছ শিকার করছেন তিনি। এতেই সংসার চলে তার। কাজের আয় দিয়ে ছেলে ফিরোজ, শাহিন, নিজাম উদ্দিন, মিজানুর ও মেয়ে আছিয়াকে নিয়ে সাত সদস্যের সংসার চলে তার। জমি-জমা না থাকায় ছোট থেকেই এই পেশায় জড়িয়ে আছেন তিনি।

মকিমাবাদ কলেজের এইসএসসির ছাত্র মিজানুরের লেখাপড়ার খরচ চলে বড়শিতে মাছ শিকারের টাকায়। লেখা পড়া না জানলেও কোনো রকমে মোবাইলফোন রিসিভ করতে শিখেছেন তিনি। নদীতে বিপদ-আপদে মোবাইল ফোনে খোঁজখবর নেন পবিবারে সদস্যরা। ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আবার কোনো দিন ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করেন তিনি বড়শিতে মাছ শিকারে।

জলিল মৃধার মতো ডিঙি নৌকায় চড়ে বড়শিতে মাছ শিকার করেন একই এলাকার হোসেন সিকদার (৫৫), রুহুল খলিফা (৫০), মাসুদ হাওলাদারসহ (৪০) অর্ধশতাধিক মাছ শিকারি। বড়শিতে মাছ শিকারে চলে এদের প্রত্যেকের সংসার। জলিল মৃধা বলেন, ‘দিনে দিনে সবকিছু পাল্টাই যাচ্ছে। চর জাইগ্যা নদী ভরাট অইতে আছে। আগের মতো অনেক মাছও আর নাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘জায়গা-জমি নাই। দিন-রাইত নদীতে ভাইস্যা মাছ শিকার করোন কস্টের কাম। ঘর-সংসার আর ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার পানে চাইয়া বড়শি বাই।’

বগী খালে নৌকা নোঙর করা ভাসান সম্প্রদায়ের ষাটোর্ধ চানবানু জানান, নদীর পানির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। তবে বড়শিতে মাছ শিকারই তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।

‘আগের সব মাছ আর গাঙে দেহা যায় না। আড়াইয়া গ্যাছে মিডা পানির কতেক মাছ।’-অভিন্ন কথা বলেন, ওই বহরের আনছার সরদার, লাল মিয়া, শমসের, শাহানাজ, রোজিনা, বাচ্চু সরদারসহ আরো অনেকে।

চর মিয়াজান বৌ-বাজার এলাকার সেলিম খান জানন, চরের অনেক কাঁকড়া শিকারিও এ সময় বড়শিতে মাছ শিকার করছেন। মাঘ ও ফাল্গুনে এদের অনেকে আবার বাগদার রেণু ধরার কাজ করেন। তেঁতুলিয়া নদী পাশের বগী, কালাইয়া, চরওয়াডেল জেলেপল্লী, মমিনপুর জেলেপল্লী, বাদামতলী, ধুলিয়া, তাঁলতলী, তাঁতেরকাঠীসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েক শ লোক এখন বড়শিতে মাছ শিকার করে জীবন চালান। আবহাওয়ার পরিবর্তন, রেনুপোনা নিধন, মা ইলিশ শিকার, নদী ভরাট, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে নদীতে মাছ এখন দুষ্প্রাপ্য হয়েছে। শিকারির বড়শিতেও আর আগের মতো মিলছে না মাছ। অনেক জেলে পরিবারের ছেলেমেয়ে নিয়ে কাটাছে দুর্বিষহ জীবন।’

গলাচিপা উপজেলার সাবেক মৎস্য কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তেঁতুলিয়া থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির কারণে পেশা ছাড়ছেন বড়শিতে মাছ শিকারিসহ অনেক জেলে।’


এই বিভাগের আরো খবর