রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ০৫:১৮ অপরাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার...

পীরকে ৩ কোটি টাকার গাড়ি উপঢৌকন

এম জেড মাহমুদ / ৪২ পড়া হয়েছে:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২০ অক্টোবর, ২০২১

পীরকে ৩ কোটি টাকার গাড়ি উপঢৌকন

গুলশানে একটি বহুমূল্যবান বাড়ির দখল, পালটা দখল নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে চলেছে। বাড়ি দখলে কেউ কেউ ক্ষমতাবলয়ে ঢেলেছেন মোটা অঙ্কের টাকা। কেউ আবার ছুটেছেন পীরের দরগায়। দিয়েছেন পিরের ছেলেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি। এতেও কাজ হয়নি। তবে নিরাশ হয়নি প্রভাবশালী মহল। পালটাপালটি মামলার শুনানি নিয়ে সব পক্ষই ছুটছে উচ্চ আদালতে।

সরেজমিন দেখা যায়, গুলশানের ৭৮ নম্বর রোডে ৬ নম্বর প্লটে পুরোনো আমলের একটি দেড়তলা বাড়ি। লেক-সংলগ্ন জমিটির আয়তন ৯ কাঠার বেশি। যার বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৬০ কোটি টাকা। মূল্যবান বাড়িটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ছুটছেন অনেকে। ইতোমধ্যে বৈধ মালিক দাবি করে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি দলিলদস্তাবেজ নিয়ে ঘুরছেন ঘাটে ঘাটে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাঘা বাঘা আইনজীবী। পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করছেন ক্ষমতাধর এক লবিস্ট

৩০ সেপ্টেম্বর সরেজমিন বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, গেটে একটি পিতলের সাইনবোর্ড লাগানো। তাতে লেখা তিউনেশিয়ার সম্মানিত কনসাল জেনারেলের বাসভবন। লোহার পকেট গেট খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ৩/৪টি পুরোনো মডেলের গাড়ি পার্ক করে রাখা। প্রতিটি গাড়িতে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর এগিয়ে আসেন বৃদ্ধ কেয়ারটেকার আজিজ। তিনি জানান, বাইরে সাইনবোর্ড থাকলেও এখানে কোনো রাষ্ট্রদূত থাকেন না। দূতাবাসের সাইনবোর্ড কেন লাগানো হয়েছে, তা তিনি জানেন না। দেখা যায়, আশপাশের প্লটে সুউচ্চ অত্যাধুনিক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে একমাত্র দ্বিতল বাড়িটি দেখতে অনেকটাই পরিত্যক্ত সম্পত্তির মতো মনে হয়।

প্রায় ৩০ বছর বাড়িটিতে বসবাস করছেন রওনক খন্দকার নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি বায়নাসূত্রে বাড়ির মালিকানা দাবি করছেন। কিন্তু তার মালিকানা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেছেন আরেক মালিক দাবিদার সিএ খালেদ রহিম। উভয়েই বাড়ির দখল পেতে মরিয়া। মালিকানা সম্পর্কে জানতে চাইলে রওনক খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, এই বাড়ির মালিক ছিলেন ফরিদা আমিন। তার কাছ থেকে তিনি প্রথমে বাড়িটি ভাড়া নেন। একপর্যায়ে ফরিদা আমিন বাড়ি বিক্রির প্রস্তাব দিলে তিনি বায়না করেন। কিন্তু রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই ফরিদা আমিন মারা যান। ফলে মালিকানার দাবিতে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। নিু আদালতের রায় আছে তার পক্ষে।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, রওনক খন্দকারকে ভাড়াটিয়া উল্লেখ করে তাকে উচ্ছেদে মামলা করেছেন সিএ খালেদ রহিম। তার পক্ষে কাজ করছেন কামরুল হুদা নামের এক প্রভাবশালী লবিস্ট। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এক উপদেষ্টার ভাগনে পরিচয়ে তিনি রাজউকে ক্ষমতাধর হিসাবে পরিচিত। লবিস্ট কামরুল হুদা যুগান্তরের কাছে দাবি করেন, জমিসহ বাড়িটির প্রকৃত মালিক সিএ খালেদ রহিম। তার বর্ণনা মতে, ১৯৬৭ সালে তৎকালীন ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট থেকে প্লট বরাদ্দ পান জনৈক রিনা হুমায়ন। তিনি ১৯৭০ সালে সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের বোন ফরিদা আমিনের কাছে প্লটসহ বাড়িটি বিক্রি করে দেন। ফরিদা আমিনের কাছ থেকে ৯৮ সালে ক্রয়সূত্রে বাড়িটির মালিক হন খালেদ রহিম। তিনি বাড়িটি বুঝে পেতে আদালতে মামলা করেছেন। তবে বাড়ির মালিকানার বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি খালেদ রহিম। ১১ অক্টোবর বক্তব্য চেয়ে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি খুদেবার্তা পাঠিয়ে বলেন, আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নন। তার আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিবুল আলমের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কাওরান বাজারে তার চেম্বারে গেলে জানানো হয়, তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। তানজিবুল আলমের ভাই ব্যারিস্টার এরশাদুল আলম প্রতিবেদকের কাছে একটি নম্বর দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বাড়ি দেখিয়েই ৫ কোটি : আদালতের চূড়ান্ত রায় পাওয়ার আগেই খালেদ রহিমের লবিস্ট কামরুল হুদা ভিন্নপথে হাঁটেন। বিবদমান বাড়িটি বিক্রির কথা বলে তিনি বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে আর ফেরত দেননি। এর মধ্যে তেজগাঁওয়ের নিউ অটো গ্যালাক্সি গাড়ি শোরুমের মালিক নজরুল ইসলাম আলম খুইয়েছেন ৫ কোটি টাকা। ভুক্তভোগী আলম বলেন, কামরুল হুদা তার শোরুম থেকে বিএমডব্লিউ এবং মার্সিডিজ ব্র্যান্ডের একাধিক গাড়ি কেনেন। পূর্বপরিচয়ের সূত্রে তার কাছে গুলশানের বাড়ি বিক্রির প্রস্তাব দেন কামরুল হুদা। তিনি তার চটকদার কথার জালে আটকা পড়েন। বাড়ি কিনতে অগ্রিম হিসাবে ৫ কোটি তুলে দেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও রেজিস্ট্রি না পেয়ে তিনি টাকা ফেরত চান। টাকা না পেয়ে একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে মামলা করেন। প্রতারণার মামলায় কামরুল হুদা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলেও টাকা ফেরত দেননি। ভুক্তভোগী আলম অভিযোগ করেন, কামরুল হুদা আটরশি পীরের মুরিদ। কথায় কথায় পীরের ক্ষমতার দাপট দেখান। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গুলশানের বাড়ির দখল পেতে লবিস্ট কামরুল হুদা ঘাটে ঘাটে উপঢৌকন পৌঁছে দেন। এর মধ্যে ফরিদপুরের আটরশি পীরের দরবারে দিয়েছেন বিশেষ উপঢৌকন। পীরের এক ছেলেকে দেন ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা মূল্যের মার্সিডিজ গাড়ি। এছাড়া বিএমডব্লিউ, জাগুয়ার এবং ল্যান্ডক্রুজার ব্র্যান্ডের কয়েকটি গাড়ি উপঢৌকন দেওয়া হয় প্রভাবশালী মহলে।

সেদিন পীরের দরগায় যা ঘটেছিল : আটরশি পীরের বড় ছেলে কথিত পীরজাদা মাহফুজুল হকের বনানীর বাড়িতে গাড়ি ডেলিভারি দিতে যান নিউ অটো গ্যালাক্সি শোরুমের গাড়িচালক মফিজুল ইসলাম। বনানী ৪ নম্বর রোডে অবস্থিত পীরের ছেলের বাড়ির সামনে যাওয়ার পর দায়িত্বরত কর্মীরা সবাইকে জুতা খুলতে বলেন। এ সময় কামরুল হুদাসহ সবাই জুতা খুলে হাতে নেন। বিশেষ ভঙ্গিতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন সবাই। পীরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে এসে মার্সিডিজে ওঠেন কামরুল হুদা এবং মাহফুজুল হক। দুুজনই গাড়ির ভেতরে বসে গাড়ির সার্বিক অবস্থা এবং বিলাসী উপকরণ পরীক্ষা করে দেখেন। এরপর তাদের কাছে গাড়ি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

নিউ অটো গ্যালাক্সি শোরুমের বিক্রয় রসিদ অনুযায়ী পীরজাদা মাহফুজুল হকের জন্য ২০১৫ সালের ১০ জুলাই গাড়িটি কেনা হয়। ক্রেতা হিসাবে কামরুল হুদার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘ভিভিড গ্রুপ’-এর নামে বিক্রয় রসিদ কাটা হয়। পরে গাড়িটি রেজিস্ট্রেশন করা হয় পীরজাদা মাহফুজুল হকের নামে। রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো ভ ১১-১৭৪০।

তবে কামরুল হুদা নামের কোনো মুরিদের কাছ থেকে গাড়ি উপঢৌকন নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন মাহফুজুল হকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং আটরশি দরবারের কর্মী বিভাগের প্রধান কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘মিয়া ভাইজান (মাহফুজুল হক) কামরুল হুদা নামের কোনো মুরিদের কাছ থেকে গাড়ি উপঢৌকন নিয়েছেন-এমন কথা সত্য নয়।’ তবে আটরশি পিরের ছোট ছেলে ফয়সাল মুজাদ্দেদির প্রেস সেক্রেটারি শামীম হায়দার বলেন, প্রতারণা এবং শৃঙ্খলাবিরোধী কাজের জন্য মুরিদ কামরুল হুদাকে অনেক আগেই পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জাকের পার্টির কার্যালয়ে প্রবেশ তার জন্য নিষিদ্ধ।

এদিকে অনুসন্ধানে লবিস্ট কামরুল হুদার দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের চিত্র বেরিয়ে আসে। ফরিদপুরের আটরশি দরবার শরিফের অদূরে সাড়ে সাতরশি এলাকায় বিলাসবহুল বাংলো নির্মাণ করেছেন কামরুল হুদা। ২৫ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে হাঁটা সরু একটি গলিপথ চলে গেছে নিচু গ্রামাঞ্চলের দিকে। কিছুদূর যেতেই সিসি ক্যামেরা লাগানো খুঁটি চোখে পড়ে। অদূরে দেখা যায় বিদেশি স্থাপত্যে নির্মিত একটি অভিজাত বাড়ি। প্রায় ৩ বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত বাড়ির প্রবেশগেট রাজকীয়। বিশাল আকারের স্টিলের গেট। দুপাশে দুটি নিরাপত্তা কক্ষ। গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায়, বিদেশি মূল্যবান টাইলস বসানো খোলা লন। মার্বেল পাথর এবং বিদেশি কাঠ দিয়ে মোড়ানো বাড়িতে আছে হেলিপ্যাড এবং সুইমিংপুল। ৯/১২ ফুট আয়তনের আমদানি করা একেকটি মার্বেল পাথরের দামই কয়েক লাখ টাকা। অজপাড়াগাঁয়ে এমন প্রাসাদোপম বাড়ি নিয়ে স্থানীয়দের জল্পনাকল্পনার শেষ নেই। বাড়িটি নির্মাণে অন্তত ২০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

অর্থ আত্মসাৎ, তদবির বাণিজ্য এবং অঢেল বিত্তবৈভবের প্রশ্ন নিয়ে কামরুল হুদার মুখোমুখি হয়  অনুসন্ধান সেল। বনানীর অফিসে বসে তিনি জানান, ‘প্রতারণা করে তিনি কারও কাছ থেকে একটি টাকাও নেননি। গাড়ি ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম আলম বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় তাকে ৫ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করায় আইন অনুযায়ী তার টাকা ফরফিট হয়ে গেছে। তারপরও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে তাকে গ্রেফতার করানো হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘তাকে লবিস্ট না বলে পরামর্শক বলা যুক্তিযুক্ত। কারণ জমিজমা-সংক্রান্ত কাজ তিনি ভালো বোঝেন বলে অনেকেই তার কাছে আসে। তিনি শুধু পরামর্শ দেন না, বরং বিনিয়োগও করেন। এটা তার বৈধ ব্যবসা। তবে এখন পর্যন্ত তিনি যা করেছেন, এর সবই আইনি কাঠামোর মধ্যে। তিনি কোনো ধরনের বেআইনি তৎপরতায় জড়িত নন।’ তার গাড়িবাড়িসহ সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আয়কর ফাইলে যথাযথভাবে প্রদর্শিত। এছাড়া সাবেক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল দাবি করে বলেন, ‘আমি তার রক্তের সম্পর্কের কেউ নই। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আমাকে বিশ্বাস করে গেছেন। তার ব্যক্তিগত বহু কাজে আমি নিয়োজিত ছিলাম।’

 


এই বিভাগের আরো খবর