মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৬:৫৩ অপরাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার...

চড়া বাজারদরে নাকাল সাধারণ মানুষ

এম জেড মাহমুদ / ৭১ পড়া হয়েছে:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

চড়া বাজারদরে নাকাল সাধারণ মানুষ

রাজধানীর মিরপুরে চিড়িয়াখানা সড়কে ঢুকতেই বাঁ পাশে ফুটপাতে প্রতিদিন কাঁচাবাজার বসে। ওই বাজারের বিক্রেতা রওশন বেগম গত বৃহস্পতিবার তিনটি ডাঁটার এক আঁটি লাউশাকের দাম চাইলেন ৩০ টাকা। বড় পরিবারে এমন দুই আঁটি লাগবে এক বেলাতেই। অর্থাৎ এক বেলার শাক কিনতেই লাগবে ৬০ টাকা। এর সঙ্গে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, সয়াবিন তেলসহ অন্য মসলাও লাগবে।

রাজধানীর বাজারে কয়েক সপ্তাহ ধরে সবজি ও মাছের বাজারে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তার আঁচ বেশি ভোগাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের। এক মাসে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া পেঁয়াজের ঝাঁজ তাঁদের নাকাল করছে। কাঁচামরিচের দামও চড়া। নতুন করে বেড়েছে সয়াবিন তেল, রসুন ও আদার দাম। আর চালের দাম কয়েক মাস ধরেই পকেট কাটছে ক্রেতাদের।

চিড়িয়াখানা সড়কের ফুটপাতের ওই বাজারের ক্রেতা মূলত স্থানীয় নিম্ন আয়ের লোকজন। ফলে বিক্রেতারাও পাইকারি বাজার থেকে তুলনামূলক কম দামের পণ্যগুলো কিনে এনে বিক্রি করেন। বাজারটি ঘুরে দেখা গেল, কাঁচা পেঁপে ও মিষ্টিকুমড়া ছাড়া প্রতিটি সবজি প্রতি কেজি ৫০ টাকা বা এর বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। চড়া মাছের দামও।

বিক্রেতা রওশন বেগম বলেন, দুই সপ্তাহ আগেও তিনি এক আঁটি লাউশাক ২০ টাকায় বিক্রি করেছেন। কিন্তু এখন বন্যার কারণে শাকসবজির দাম চড়া।

কেবল এই বাজার নয়, রাজধানীর সব কাঁচাবাজারেই দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ১৫ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টি ও বন্যার কারণে যেসব এলাকায় সবজি চাষ হয় বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ সবজিখেত নষ্ট হয়ে গেছে। আর এ সময়টায় গ্রীষ্মকালীন সবজির মৌসুম শেষের দিকে বলে সরবরাহও কম থাকে। ফলে দাম চড়া।

ছেলেকে বিদ্যালয় থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় চিড়িয়াখানা সড়কের বাজারটিতে কেনাকাটা করছিলেন কামরুন নাহার। তাঁর স্বামী অটোরিকশাচালক। শাকসবজি ও মাছ কেনার জন্য তিনি দিনে স্ত্রীকে কখনো ১৫০, কখনো ২০০ টাকা দেন। তিনি বলেন, ‘২০০ টাকায় এখন কিছুই পাওয়া যায় না। আজ ১২০ টাকা দিয়ে আধা কেজি কাঁচকি মাছ কিনেছি। বাকি ৮০ টাকায় সবজি অথবা শাক, কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজ কেনা লাগবে। হঠাৎ করে বাজার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে কী অবস্থা হবে কে জানে?’

মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের বাজারটিতে ক্রেতা স্থানীয় মধ্যম আয়ের মানুষ। রাজধানীর আশপাশের জেলা থেকে তাজা শাকসবজি আসে এই বাজারে। নদীর মাছও পাওয়া যায়।

বাজারটি ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা থেকে শুরু। বেগুন, ঢ্যাঁড়স, ঝিঙে, গাজর, দেশি শসা ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। প্রতি কেজি করলার দাম চাওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা। এই বাজারেও কম দামি সবজির মধ্যে মিলছে কেবল কাঁচা পেঁপে ও কুমড়া, তাও প্রতি কেজি ৪০ টাকা। সবজি বিক্রেতা ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে ভালো মানের সবজি আসে। তাই দাম এমনিতেই বেশি। এর ওপর এখন বৃষ্টি ও বন্যার কারণে বাজার আরও চড়েছে।’

শাকসবজি খেতে যে কুচে চিংড়ির দরকার, তা ৬ নম্বর বাজারে ৪০০ টাকা কেজি চেয়েছেন বিক্রেতারা। এ ছাড়া বেলে ও চিংড়ি আকারভেদে ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা, বোয়াল ৪০০-৬০০ টাকা, ট্যাংরা ৮০০ টাকা, চাষের ট্যাংরা ৫০০ টাকা, শিং ৬০০-৮০০ টাকা, বাচা ৬০০ টাকা, রুই-কাতলা মান ও আকারভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং আইড় আকারভেদে ৬০০-৯০০ টাকা কেজি হাঁকা হচ্ছিল। অবশ্য চাষের কই, পাঙাশ ও তেলাপিয়ার দাম আগের মতোই। প্রতি কেজি মিলছে ১৪০-১৮০ টাকার মধ্যে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সব মাছের দামই চড়া। সবাই বলে ইলিশের দাম কমেছে। মাঝারি ইলিশের কেজি যদি ৮০০ টাকা হয়, সেটি কি কম হলো?’

কল্যাণপুর নতুন বাজারটির দুটি ভাগ। বাজারের মূল অংশে এলাকার মধ্যবিত্ত লোকজন এবং নতুন হওয়া অংশে কল্যাণপুর পোড়া বস্তির বাসিন্দারা বাজার বেশি করেন। গতকাল শুক্রবার দুটি অংশে বাজার করতে আসা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১৫ টাকা এবং বিভিন্ন পদের মাছের দাম বেড়েছে।

পোড়া বস্তির বাসিন্দা ভ্যানগাড়িচালক ফারুক মিয়ার পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৭ জন। প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কেজি চাল লাগে। তিনি বলেন, ‘যা কামাই করি তাতে এখন পেট ভরে খাওয়াই কষ্ট। আগে এক বস্তা চাল কিনতাম ১ হাজার ৭০০ টাকায়। এখন কিনি ২ হাজার টাকায়। আর কম দামে সবজি খাওয়ার দিনও শ্যাষ। ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নাই।’

কয়েক মাস ধরে চালের চড়া দামের কারণে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ কষ্টে আছেন। রাজধানীর খুচরা বাজারে এখন মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৪৩ থেকে ৪৫ টাকা। গত বছরের এই সময়েও যা ছিল ৩০ থেকে ৩৪ টাকা। মাঝারি মানের চালের দামও উঠেছে ৪৭ থেকে ৫০ টাকায়। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। কোথাও কোথাও আরও বেশি।

গত এক মাসে পেঁয়াজের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দেশি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকা আর আমদানি করা পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, এক মাস আগে প্রতি কেজি দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ২২ থেকে ৩২ টাকা ছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতে দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বাজারে প্রভাব পড়েছে।

গতকাল দুপুরে তেজগাঁওয়ের কলমিলতা কাঁচাবাজারের ক্রেতা মাসুদ আহমেদ বলেন, ‘পেঁয়াজসহ অন্যান্য পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কারও উদ্যোগ নেই। এখন বন্যায় সবজি, মাছ সবকিছুর দাম বাড়তি। সবাই বলছে, দাম নাকি আরও বাড়বে। স্বল্প আয়ের লোকজন বাঁচবে কীভাবে।’

কোরবানির ঈদের আর দুই সপ্তাহও বাকি নেই। তার আগেই বাড়ছে আদা, রসুনের দাম। ৬ নম্বর সেকশনের বাজারের পেঁয়াজ-রসুন বিক্রেতা শাহজাদা রহমান বলেন, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আদা ও রসুনের দাম কেজিতে ২০ টাকা করে বেড়েছে। এক কেজি আদা আগে ১২০ টাকা ছিল, এখন ১৪০ টাকা। বড় রসুনের দামও ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা হয়েছে।

কারওয়ান বাজারের বিক্রেতারা বলেন, সম্প্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ২ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে। এখন বাজারে পাঁচ লিটারের একটি বোতল বিক্রি হচ্ছে ৫৩০-৫৪০ টাকা দরে।


এই বিভাগের আরো খবর