মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৬:১০ অপরাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার...

ঠাকুর গাঁয়ের কনিকার সফলতার গল্প

চলমান বাংলা ডেক্স / ৮৪ পড়া হয়েছে:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

মাত্র এগারো বছর বয়সেই মারা যান কনিকার বাবা। পরে কাজের সন্ধানে মা ফাতেমা বেগম দুই মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে চলে যান ঢাকার টঙ্গিতে। সেখানে একটি পোশাক কারখানায় অল্প বেতন কাজ জুটিয়ে নেন। স্বপ্ন দেখেন মেয়ে কনিকাকে ডাক্তারি পড়াবেন। তাই একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করেন। কিন্তু নিম্ন আয়ের সংসারে টানপোড়ন দেখে স্কুল ছেড়ে দেন কনিকা। কাজ শুরু করেন টঙ্গির এক হেয়ার ফ্যাশন কারখানায়। গল্পের শুরুটা এখানেই।

মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই বিয়ে হয় কনিকার। এক সাগর পাড়ি দিয়ে গিয়ে পড়েন অন্য এক সাগরে। এখানেও নিত্য সঙ্গী অভাব। স্বামীর সংসারে নুন আনতে পন্তা ফুরায়। বিয়ের দুই বছরের মাথায় কন্যা সন্তানের মা হন কনিকা। এর পর কোল জুড়ে আসে আরেকটি কন্যা সন্তান। সংসারে সদস্য বাড়লেও বাড়েনি রোজগার। সংসারের অভাব মোচনের জন্য ঢাকায় স্বামীকে রেখে নিজ এলাকায় ফেরেন তিনি।

যেই ভাবেই হোক ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন কনিকা। এই স্বপ্ন পুরণে সহযোগিতা করে স্থানীয় একটি এনজিও। সামান্য পুঁজি, সঞ্চিত অভিজ্ঞতা এবং এনজিও থেকে ২০ হাজার টাক ঋণ নিয়ে শুরু হয় কনিকার পথ চলা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা জগন্নাথপুর ভালুকা গ্রামে স্বামীর বাড়ির উঠানে স্থাপন করেন অভিনয় শিল্পীদের মাথায় ব্যবহার এবং যাদের মাথায় চুল নেই তাদের মাথা ঢাকার জন্য চুলের টুপি (পরচুলা) তৈরির কারখানা। বিভিন্ন বিউটি পার্লার থেকে সংগ্রহ করেন নারীদের মাথার চুল। ওই চুল দিয়ে তৈরি করছেন টুপি বা ক্যাপ। সাড়ে তিন বছর আগে শুরু করা ক্ষুদ্র এই শিল্পটি কালের পরিক্রমায় বর্তমানে বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। তার উৎপাদিত চুলের টুপি রাজধানী ঢাকা ঘুরে ভারতসহ চলে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশে।

কঠোর পরিশ্রমী ও আত্মপ্রত্যয়ী এই নারী চুলের টুপি তৈরি করে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন, স্বাবলম্বী করেছেন অন্যদেরও। তার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামীণ জনপদের শতাধিক পরিবার। এখানে কাজ করা নারীরা এখন শক্ত হাতে ধরেছেন স্বামীর সংসারের হাল।

কনিকা বেগম বলেন, বিউটি পার্লার থেকে চুল সংগ্রহ করে ওই চুল দিয়ে টুপি তৈরি করি। যা আমার ভাগ্য পরিবর্তন করেছে। এক সময় আমি একাই এই কাজ করতাম। এখন প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেক শ্রমিক তৈরি করেছি। এখন শ্রমিক আর কারখানার দেখা শোনা করি। স্বামী ঢাকায় এই পণ্য বাজারজাতের কাজ করছেন। আমার কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছেন এলাকার শতাধিক নারী। তাদের মধ্যে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীও রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিদিন তৈরি হয় কমপক্ষে ৪০-৫০টি টুপি। আর এই চুলের টুপি (পরচুলা) বিক্রির টাকায় চলে ওই সব খেটে খাওয়া শ্রমিকের সংসার। চলে অনেকের পড়াশোনার খরচ। তারা মাসিক আয় করেন আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, এককালের দারিদ্র পিরীত গ্রামটি এখন আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। কনিকা এখন সফল একজন নারী উদ্যোক্তা। তার মাধ্যমে অন্য নারীরা যেন স্বাবলম্বী হতে পারে সেজন্য কাজ করছে জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর।

এই গ্রামের কনিকাই যেন পথের দিশারি হয়ে দাঁড়িয়েছেন অসহায় নারীদের। তিনি এই শিল্পের প্রসারের জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করেছেন।


এই বিভাগের আরো খবর